উপন্যাস : তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে
লেখিকা : নৌশিন আহমেদ রোদেলা
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল :
রচনাকাল :
লেখিকা নৌশিন আহমেদ রোদেলার “তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে” শিরোনামের এই ধারাবাহিক উপন্যাসটি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া হয়েছে। ‘কবিয়াল’ পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি পর্ব আকারেই প্রকাশিত হবে। লেখিকা অনবদ্য এ উপন্যাসটি তার ফেসবুক পেজে ২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে লেখা শুরু করেছেন।
![]() |
| তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে || নৌশিন আহমেদ রোদেলা |
তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে || নৌশিন আহমেদ রোদেলা (পর্ব - ৫)
জঙ্গলের ভেতর বাতাসটা যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠেছে।
তপুর শ্বাসপ্রশ্বাস এখনও স্বাভাবিক হয়নি। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত ছন্দে। হাতের তালু ঘামে ভিজে গেছে। মাটির উপর পড়ে থাকা সেই পুরনো ঘুঙুরটা এখনও তার হাতে ধরা—কিন্তু এখন সেটাকে আর নিছক একটা বস্তু মনে হচ্ছে না। যেন এর ভেতরে জমাট বেঁধে আছে বহু বছরের জমে থাকা কান্না, আতঙ্ক, আর রক্তাক্ত স্মৃতি।
মিতু তপুর হাত শক্ত করে ধরে বললো,
“এটা ফেলে দে! এখনই ফেলে দে তপু!”
তপু যেন শুনছেই না। তার চোখ এখনও ঝাপসা। কানে ভেসে আসছে সেই মেয়েটার কান্না—“বাঁচাও…”
একটা অদ্ভুত যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়লো তার বুকজুড়ে।
রুহুল আমিন এবার কঠিন গলায় বললেন,
“তপু, আমি বলছি—ওটা নিচে রাখো।”
এই গলায় আদেশ থাকে। সেনাবাহিনীর বছরের পর বছর শাসন, নেতৃত্ব—সব মিশে আছে তাতে। তপু অবচেতনেই ঝটকা খেয়ে বাস্তবে ফিরে এলো। ধীরে ধীরে হাত খুলে ঘুঙুরটা মাটিতে ফেলে দিলো।
মাটিতে পড়তেই একটা মৃদু শব্দ হলো—
টিং…
কিন্তু সেই শব্দ যেন অস্বাভাবিকভাবে অনেকক্ষণ ধরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো চারপাশে।
তিনজনই চুপ।
জঙ্গলের ভেতর হালকা বাতাস বইছে। পাতা কাঁপছে। কিন্তু তার মাঝেও একটা চাপা অস্বস্তি স্পষ্ট। যেন কেউ… খুব কাছে দাঁড়িয়ে তাদের দেখছে।
রুহুল আমিন নিচু হয়ে পায়ের ছাপগুলো ভালো করে দেখলেন। অভিজ্ঞ চোখে পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
“এই জায়গাটা আরেকটু খতিয়ে দেখতে হবে।”
মিতু তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করলো,
“না বড় মামা! আমরা এখনই বাড়িতে ফিরে যাই। এটা স্বাভাবিক কিছু না।”
রুহুল আমিন তাকালেন তার দিকে।
চোখে অদ্ভুত এক কঠোরতা।
“আমি জীবনে অনেক কিছু দেখেছি, মিতু। পাহাড়, জঙ্গল, যুদ্ধ… কিন্তু ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়া শিখিনি।”
মিতু চুপ করে গেলো, কিন্তু মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি।
তপু এবার ধীরে ধীরে বললো,
“বড় মামা… আমি যা দেখেছি… সেটা কোনো হ্যালুসিনেশন না।”
“তুমি কী দেখেছো?” — শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
তপু কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। যেন শব্দ খুঁজছে। তারপর ধীরে ধীরে বললো—
“একটা মেয়ে… ছোট্ট… ও দৌড়াচ্ছিলো। খুব ভয় পেয়েছিলো। কেউ ওকে তাড়া করছিলো…”
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো।
“তারপর… ওকে ধরে ফেললো একজন। আর… আর—”
তপু চোখ বন্ধ করে ফেললো।
চিত্রটা আবারও ভেসে উঠছে চোখে।
“লোকটার মুখটা পরিষ্কার দেখিনি… কিন্তু—”
সে চোখ খুললো।
“সে দেখতে রুদ্র ভাইয়ার মতো।”
এইবার নিস্তব্ধতা আরও গভীর হলো।
মিতু অবিশ্বাসে তাকিয়ে আছে।
“তুই কী বলছিস তপু? এটা কীভাবে সম্ভব?”
তপু মাথা নাড়লো।
“আমি জানি না… কিন্তু আমি যা দেখেছি, সেটা সত্যি।”
রুহুল আমিন এবার গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন। তার চোখে সেই পুরনো, অভিজ্ঞ সৈনিকের সতর্কতা ফিরে এসেছে।
“রুদ্র…” — ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন তিনি।
“তুমি তাকে চেনো?” — দ্রুত জিজ্ঞেস করলো তপু।
রুহুল আমিন সরাসরি উত্তর দিলেন না। বরং বললেন,
“চেনা না… তবে নামটা অপরিচিত না।”
(ঢাকা — একই সময়)
রুদ্র বিছানার ধারে বসে আছে।
আজ তার ভেতরে এক অস্থিরতা কাজ করছে। অকারণে নয়—
সে জানে, কিছু একটা ঘটছে।
মাথার ভেতর বারবার ফিরে আসছে সেই জায়গা… সেই জঙ্গল… সেই রাত।
মারিয়া দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, আগের মতোই নিঃশব্দ।
রুদ্র হঠাৎ বললো,
“তুমি কি কখনো এমন কিছু অনুভব করেছো… যেটা ঘটছে অনেক দূরে, কিন্তু তবুও তুমি সেটা বুঝতে পারছো?”
মারিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
“ইনটুইশন?”
রুদ্র হালকা হাসলো।
“না… এটা তার থেকেও বেশি কিছু।”
সে উঠে দাঁড়ালো। ধীরে ধীরে জানালার দিকে এগিয়ে গেলো।
“ওরা আবার শুরু করেছে…”
মারিয়া এবার একটু নড়লো।
“কে?”
রুদ্র জানালার কাচে হাত রেখে বললো—
“ওরা… যারা ওই জঙ্গলে থাকে।
যারা একটা শিশুকে মেরে… তাকে মাটি চাপা দিয়েছিলো।”
তার গলা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠলো।
“আমি ভেবেছিলাম… সব শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু না…”
সে চোখ বন্ধ করলো।
“ওটা এখনও বেঁচে আছে।”
মারিয়া এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি কীভাবে জানেন এসব?”
রুদ্র ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরে তাকালো।
চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা।
“কারণ… আমি ছিলাম সেখানে।”
(তপোবন — বিকেল)
আকাশ আবারও মেঘে ঢেকেছে।
বাড়ির ভেতর একটা অস্বস্তিকর নীরবতা।
মিতু বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন লুকিয়ে আছে গাছের আড়ালে।
তপু টেবিলে বসে কিছু লিখছে। তার চোখে এখন ভয় কম—বরং এক ধরনের জেদ কাজ করছে।
“আমি আজ রাতটা ওয়েট করবো।” — হঠাৎ বললো সে।
মিতু ঘুরে তাকালো।
“কিসের জন্য?”
“ওই শব্দটার জন্য।
আমি দেখতে চাই—ওটা আসলে কী।”
মিতু বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো।
“তুই পাগল হয়ে গেছিস! গত রাতে যা হয়েছে—”
“ওটাই ক্লু আপা।” — শান্ত গলায় বললো তপু।
“ওটা আমাদের কিছু দেখাতে চায়।”
মিতু ধীরে ধীরে মাথা নাড়লো।
“না… ওটা আমাদের ডেকে নিচ্ছে।”
তপুর চোখে হালকা হাসি ফুটলো।
“তাহলে আমরা দেখবো—ওটা আমাদের কোথায় নিয়ে যায়।”
ঠিক তখনই—
বাড়ির পুরনো ল্যান্ডলাইনের ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠলো।
ট্রিং… ট্রিং… ট্রিং…
তিনজনই চমকে উঠলো।
এই নির্জন জায়গায়… ফোন?
রুহুল আমিন ধীরে ধীরে রিসিভার তুললেন।
“হ্যালো?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর—
একটা খুব ধীর, কর্কশ কণ্ঠ—
“…ওকে থামান…”
রুহুল আমিন ভ্রু কুঁচকালেন।
“কে বলছেন?”
ওপাশ থেকে আবারও শব্দ—
“ও… ফিরে এসেছে…”
লাইন কেটে গেলো।
ঘরের ভেতর ঠান্ডা নেমে এলো।
তপু ফিসফিস করে বললো—
“…কে ফিরে এসেছে?”
রুহুল আমিন ধীরে ধীরে রিসিভার নামালেন।
চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি।
“যদি আমি ভুল না করি…”
তিনি বললেন—
“তাহলে আমরা এমন কিছুর সামনে দাঁড়িয়ে আছি… যেটা অনেক বছর আগে মারা যাওয়ার কথা ছিলো।”
চলবে ...
৬ষ্ঠ পর্ব পড়তে এখানে ট্যাপ/ক্লিক করুন
লেখক সংক্ষেপ :
তরুণ লেখিকা নৌশিন আহমেদ রোদেলা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায়নি। তবে জানতে পারলে তা অবশ্যই কবিয়াল পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হবে।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন